পূর্ণাঙ্গ কাস্টম হাউজ ঘোষণার পরও বৈশ্বিক অর্থনৈতিক সংকট, অবকাঠামোগত দুর্বলতা, আধুনিক যন্ত্রপাতির অভাব এবং অন্যান্য বন্দরের তুলনায় অপেক্ষাকৃত কম সুবিধা থাকায় সাতক্ষীরার ভোমরা স্থল বন্দর দিয়ে ভারত থেকে পণ্য আমদানি-রপ্তানি আশঙ্কাজনক হারে কমে গেছে। যার প্রভাব পড়েছে বন্দরের রাজস্ব আদায়ে। আগে যেখানে প্রতিদিন ২৫০-৩০০টি ভারতীয় পণ্যবাহী ট্রাক বন্দরে ঢুকতো এখন তা কমে ১৬০ এর মধ্যে দাঁড়িয়েছে। ফলে আমদানি হ্রাসের কারণে সরকার নির্ধারিত রাজস্ব আদায়ে ঘাটতির শঙ্কা দেখা দিয়েছে।
এছাড়া মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধের কারণে বৈশ্বিক অর্থনৈতিক মন্দা, ডলার-সংকট এবং দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের টানাপোড়েনের কারণে পণ্য আমদানিতে স্থবিরতা দেখা দেওয়ায় রাজস্ব সংগ্রহের নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রার প্রায় অর্ধেকে নেমে এসেছে বলে দাবি বন্দর সংশ্লিষ্ট ও ব্যবসায়ীদের।
ভোমরা স্থলবন্দর কর্তৃপক্ষ জানায়, আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের মন্দাভাব ও নানা প্রতিকূলতার মধ্যেও চলতি অর্থবছরে সাতক্ষীরার ভোমরা স্থল বন্দর কাস্টমস হাউসে ২ হাজার ৩৮৩ কোটি টাকা রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)। অর্থবছর শুরুর প্রথম মাস জুলাইয়ে রাজস্ব আদায় হয়েছে মাত্র ৯৯ দশমিক ৬১ কোটি টাকা। যেখানে প্রতিমাসে গড়ে ১৯৮ দশমিক ৫৮ কোটি টাকা রাজস্ব আদায় হওয়ার কথা। এর আগে বিগত অর্থবছরে স্থলবন্দরে রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছিল ২০৬৪ দশমিক ৮৯ কোটি টাকা। কিন্তু আদায় হয়েছিল মাত্র ১১১৪ দশমিক ১৬ কোটি টাকা। বিগত অর্থ বছরে রাজস্ব আদায়ের ঘাটতি ছিল ৯৫০ দশমিক ৭৩ কোটি টাকা। নানা জটিলতার কারণে বন্দরে বড় ধরনের রাজস্ব ঘাটতি দেখা দিয়েছিল।
বন্দরসংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীদের মতে, সাতক্ষীরার ভোমরা স্থলবন্দরকে পূর্ণাঙ্গ কাস্টম হাউজ ঘোষণার পরও বন্দরে ব্যবসায়িদের প্রয়োজনীয় সুযোগ সুবিধার পাশাপাশি ব্যবসাবান্ধব পরিবেশ সৃষ্টি হয়নি। যে কারণে বন্দরে প্রতিযোগিতামূলক সুস্থ ব্যবসাবান্ধব পরিবেশের ঘাটতি থাকায় এখানকার অনেক শীর্ষ ব্যবসায়ী এই বন্দর থেকে মুখ ফিরিয়ে অন্য বন্দরে চলে যাচ্ছেন। ফলে আমদানি-রপ্তানি বাণিজ্যে স্থবিরতা দেখা দিয়েছে, যার প্রভাব পড়ছে সামগ্রিক রাজস্ব আদায়ে।
বন্দরের ব্যবসায়ী গণেশ ঘোষ জানান, মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধের কারণে বিশ্ব অর্থনীতিতে এখন মন্দাভাব চলছে। এই পরিস্থিতিতে ডলারের বাড়তি দর ও ভারতীয় পণ্যের দাম বাড়ায় লোকসানের ঝুঁকিতে আমদানি থমকে গেছে। এছাড়া অন্যান্য বন্দরের তুলনায় এখানে কম সুবিধা থাকায় ব্যবসায়ীরা কোনোভাবেই ঝুঁকি নিতে চাইছেন না। যে কারণে ভোমরা বন্দরে আমদানি-রপ্তানি কমেছে।
ভোমরা সিঅ্যান্ডএফ এজেন্টস অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক আবু মুসা জানান, এই বন্দর দিয়ে বর্তমানে বিভিন্ন ধরনের পাথর, শুকনা মরিচ, ছোলার ভুসি, গমের ভুসি, কোয়ার্টস পাউডার, আনার, টমেটো, খোসাসহ চিনা বাদাম, কাঁচা মরিচ, হলুদ, খোসাসহ তেঁতুল, স্যান্ডস্টোন, চায়না ক্লে, ফায়ার ক্লে, ক্যাপসিক্যাম, খেজুর ও ফেডসপার পাউডারসহ মাত্র ১৭ ধরনের পণ্য আমদানি হচ্ছে। পণ্য আমদানি কমার কারণে ব্যবসা স্থবির হয়ে পড়েছে। একই সাথে পূর্ণাঙ্গ কাস্টম হাউজের সুবিধা ব্যবসায়ীরা পাচ্ছেন না।
সাতক্ষীরা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিজের সভাপতি নাসিম ফারুক খান মিঠু বলেন, ভোমরা স্থলবন্দরকে পূর্ণাঙ্গ কাস্টমস হাউস ঘোষণা করা হয়েছে। এই বন্দর দিয়ে সব ধরনের পণ্য আমদানির অনুমতি থাকলেও প্রশাসনিক জটিলতার কারণে বর্তমানে মাত্র গুটিকয়েক পণ্য আমদানি হয়ে থাকে। গত ৩ আগস্ট মাত্র ১৭ ধরনের পণ্য আমদানি হয়েছে।
তিনি আরো বলেন, বন্দরকে গতিশীল করতে প্রশাসনিক জটিলতা দূর করা জরুরি। অবকাঠামোগত উন্নয়নের পাশাপাশি অন্যান্য বন্দরের সঙ্গে বৈষম্য কমিয়ে এনে ব্যবসায়ীদের আস্থা ফেরাতে কার্যকর উদ্যোগ না নিলে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড কর্তৃক নির্ধারিত রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা অর্জন কঠিন হবে।
ভোমরা কাস্টমস হাউসের রাজস্ব কর্মকর্তা (প্রশাসন) মোঃ মিজানুর রহমান জানান, এলসি কমে যাওয়া ও উচ্চ শুল্কের পণ্য না আসায় মন্দাভাব নেমে এসেছে।
বন্দরের জটিলতা ও সমস্যা নিরসনে সম্প্রতি ভোমরা কাস্টমস হাউসের জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠক করেন ব্যবসায়ী নেতারা। ব্যবসায়ীদের বিভিন্ন সমস্যার কথা শুনে ভোমরা কাস্টমস হাউজের কমিশনার মুশফিকুর রহমান বিদ্যমান সংকটগুলো দ্রুততম সময়ে সমাধানের আশ্বাস দেন।
খুলনা গেজেট/এনএম

